জীববৈচিত্র সংরক্ষণের কৌশল বা উপায়গুলি আলোচনা করো।
দ্বাদশ শ্রেণীর পরিবেশবিদ্যা
প্রথম অধ্যায় জীববৈচিত্র্য
- জীববৈচিত্রের সংরক্ষণ
- জীববৈচিত্র সংরক্ষণের কৌশলসমূহ
- ইন-সিটু সংরক্ষণ কাকে বলে ?
- এক্স-সিটু সংরক্ষণ কাকে বলে ?
বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক এবং মনুষ্যসৃষ্ট কারণে জীব বৈচিত্র্য ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছেছে। কিন্তু পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা এবং মানুষ সহ সমস্ত জীবকুলের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে জীববৈচিত্র যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা আমরা জানি। তাই জীববৈচিত্রের সংরক্ষণ করাটা অত্যন্ত জরুরী। জীব বৈচিত্র্য সংরক্ষণের মূলত দুটি উপায় রয়েছে। নিম্নে সেই উপায় গুলি সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো।
জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের উপায় বা কৌশল
জীব বৈচিত্র কে মূলত দুটি উপায়ে সংরক্ষণ করা হয়। যথা ইনস্টিটিউট সংরক্ষণ ও এক্স সিটু সংরক্ষণ। নিম্নে এই দুই প্রকার সংরক্ষণের কৌশলগুলি আলোচনা করা হলো।
ইন-সিটু সংরক্ষণ বা স্বস্থানিক সংরক্ষণ কৌশল :
বিভিন্ন প্রকার জিব প্রজাতি প্রাকৃতিক পরিবেশে যে অবস্থায় রয়েছে তাকে তার নিজস্ব আবাসস্থলে রেখে রক্ষণাবেক্ষণ এবং লালন পালন করার মাধ্যমে সংরক্ষণ করার পদ্ধতিতে কে ইন-সিটু সংরক্ষণ বলে। নিম্নে এই ধরনের সংরক্ষণ কৌশলগুলি সম্পর্কে আলোচনা করা হলো -
1) অভয়ারণ্য - যেসব অরণ্যে বন্যপ্রাণীরা স্বাধীনভাবে বিচরণ করে খাদ্য গ্রহণ করে এবং প্রজননে লিপ্ত হয় সেই অরণ্যকে অভয়ারণ্য বলে। এই অভয়ারণ্যগুলিকে রাজ্য রাজ্য সরকারের অধীনে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। যেমন পশ্চিমবঙ্গের 'জলদাপাড়া অভয়ারণ্য'।
2) জাতীয় উদ্যান : যে সকল উদ্যানে বন্যপ্রাণী শিকার গাছ কাটা, মাছ ধরা, ফুল ফল ও মধু আহরণ করা ইত্যাদি কাজ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ বলে পরিগণিত হয় সেই সকল উদ্যান কে জাতীয় উদ্যান বলে। এই সকল উদ্যান কেন্দ্র সরকারের অধীনে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। যেমন উত্তর প্রদেশের করবেট ন্যাশনাল পার্ক।
3) সংরক্ষিত বনাঞ্চল : যে সকল বনাঞ্চল সাধারণ জনগণের প্রবেশ একেবারে নিষিদ্ধ তবে পরিবেশ সংক্রান্ত গবেষণার কাজে অনুমতি সাপেক্ষে সেখানে প্রবেশ করা যায় সেই সকল বনাঞ্চলকে সংরক্ষিত বনাঞ্চল বলে। যেমন গুজরাটের 'গির ফরেস্ট'। এই সকল বনাঞ্চল সাধারণত রাজ্য সরকারের অধীনে সংরক্ষিত হয়।
4) প্রটেক্টেড অঞ্চল : কোনো এক বনভূমির কোনো এক নির্দিষ্ট এলাকায় উপস্থিত কোন বিপন্ন প্রজাতির সংরক্ষণের জন্য যখন সর্বদা পাহারার ব্যবস্থা করা হয় তখন সেই অঞ্চলকে প্রোটেক্টেড অঞ্চল বলে। এই অঞ্চলও রাজ্য সরকারের আইন কানুন দ্বারা প্রটেক্ট করা হয়। যেমন পশ্চিমবঙ্গের 'সজনেখালি' প্রোটেক্টেড অঞ্চল।
5) বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ : বিশেষ কোনো কারণে পরিবেশের কোন অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেই স্থানে বসবাসযোগ্য বিভিন্ন জীব প্রজাতির বসবাসের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করার কৌশলকে বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ বলা হয়। যেমন পশ্চিমবঙ্গের 'সুন্দরবন'।
এক্স-সিটু সংরক্ষণ বা অস্থানিক সংরক্ষণ কৌশল :
যখন কোন জীব প্রজাতিকে সংরক্ষণ করার জন্য তার নিজস্ব প্রাকৃতিক পরিবেশ বা বাসস্থানের বাইরে এনে কৃত্রিম পরিবেশে সংরক্ষণ করা হয় তখন সেই সংরক্ষণ কৌশলকে এক্স-সিটু সংরক্ষণ কৌশল বলে। নিম্নে এই প্রকার বিভিন্ন ধরনের সংরক্ষণ কৌশল গুলি সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।
1) বীজ ব্যাংক : বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদের উন্নত মানের বীজ একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় অনির্দৃষ্টকালের জন্য সংরক্ষণ করার পদ্ধতিকে বা স্থানকে বীজ ব্যাংক বলা হয়। যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় বীজ ব্যাংক।
2) জিন ব্যাংক : এটি একপ্রকার প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে উন্নত মানের বিভিন্ন ধরনের জীব প্রজাতির সংরক্ষণের পদ্ধতি। এই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বিভিন্ন প্রজাতির জীবের উন্নতমানের জিনসমূহকে সংরক্ষণ করা হয়। যেমন ভারতের বোটানিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া কর্তৃক পরিচালিত জিন ব্যাংক।
3) ক্রায়োসংরক্ষণ : বিভিন্ন জীব প্রজাতির নমুনা সমূহকে বিশেষ কৌশলে -১৯৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় তরল নাইট্রোজেনে সংরক্ষণ করার পদ্ধতিকে ক্রায়োসংরক্ষণ বলা হয়। এই সংরক্ষণ পদ্ধতিতে বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদের ভ্রুণ, পরাগরেণু, কোষ এবং বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীদের শুক্রানু, ডিম্বাণ বা বিভিন্ন ধরনের কোষকে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে সংরক্ষণ করা হয়। এছাড়াও বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, মস ইত্যাদি সংরক্ষণ করা হয় এ পদ্ধতিতে।
4) চিড়িয়াখানা বা জুওলজিক্যাল গার্ডেন : এটি হলো এক ধরনের প্রশস্ত উদ্যান বা প্রতিষ্ঠান যেখানে বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীদের লালন-পালন করে তাদের প্রজননের চেষ্টা করা হয় এবং জনসাধারণের মনোরঞ্জন করা হয়। যেমন কলকাতার আলিপুরে অবস্থিত ইন্ডিয়ান জুলজিক্যাল গার্ডেন।
5) বোটানিক্যাল গার্ডেন : পৃথিবীর বিভিন্ন ভৌগোলিক অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা বিভিন্ন উদ্ভিদ প্রজাতিকে যখন এক সিটু সংরক্ষণ পদ্ধতিতে রক্ষণাবেক্ষণ এবং লালন পালন করা হয় তাকে বোটানিক্যাল গার্ডেন বলে। যেমন হাওড়ার শিবপুরের ইন্ডিয়ান বোটানিক্যাল গার্ডেন, লখনৌয়ের ন্যাশনাল বোটানিক্যাল গার্ডেন ইত্যাদি।
বিশেষ দ্রষ্টব্য : লেখাটি আপনার পড়াশুনার ক্ষেত্রে কাজে লাগলে সোশ্যাল মিডিয়ায় অবশ্যই বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন। আর এই পোস্ট সম্পর্কিত আপনার কাছে নতুন কোনও তথ্য থাকলে কমেন্টের মাধ্যমে বা ইমেইল করে আমাদের জানান।
0 Comments