মনোযোগ কাকে বলে ?
মনোযোগের শর্ত / নির্ধারকগুলি কি কি
![]() |
| মনোযোগের সংজ্ঞা | মনোযোগের নির্ধারক |
আজকের এই পোস্টটি দ্বাদশ শ্রেণীর প্রথম অধ্যায় শিখন থেকে করা হয়েছে। এই অধ্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে - মনোযোগ কাকে বলে? মনোযোগের নির্ধারক বা শর্তগুলি আলোচনা কর। এই পোস্টটি পড়ে আপনি মনোযোগ সম্পর্কে যেসব বিষয় জানতে পারবেন সেগুলি হল -
- মনোযোগের সংজ্ঞা বা মনোযোগ বলতে কী বোঝো?
- মনোযোগের নির্ধারক কয় প্রকার ও কি কি?
- মনোযোগের ব্যক্তিগত নির্ধারক কাকে বলে?
- মনোযোগের বস্তুগত নির্ধারক কাকে বলে?
- মনোযোগের ব্যক্তিগত নির্ধারক গুলি কি কি?
- মনোযোগের বস্তুগত নির্ধারকগুলি কি কি?
- মনোযোগের নির্ধারকগুলি কিভাবে ব্যক্তির মনোযোগ কে প্রভাবিত করে?
মনোযোগ কাকে বলে?
মনোযোগ একটি
বহুল প্রচলিত শব্দ। সাধারণভাবে কোনও বিষয়ের সঙ্গে মনের যোগকে বলে মনোযোগ। তবে মনোযোগ কি বা কাকে বলে সে সম্পর্কে বিভিন্ন মনোবিদ বিভিন্ন
সংজ্ঞা দিয়েছেন।
Ribot –এর মতে, কোনও বস্তুতে মনকে কেন্দ্রীভূত করার প্রক্রিয়া হল মনোযোগ।
Stout বলেছেন, মনোযোগ হল ইচ্ছামূলক মানসিক সক্রিয়তা যা জ্ঞানকে নির্ধারণ করে।
Woodworth মনে করেন, অনেকগুলি উদ্দীপকের মধ্যে থেকে কোনো একটি বিশেষ উদ্দীপক বেছে নেওয়ার প্রক্রিয়াকে মনোযোগ বলে।
McDougall বলেছেন, যে মানসিক সক্রিয়তা জ্ঞানমূলক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে তাকে মনোযোগ বলে।
Dumville –এরমতে, Attention is the concentration of consciousness upon one subject rather than upon another.
উপরিউক্ত
সংজ্ঞাগুলি বিশ্লেষণ করে মনোযোগ সম্পর্কে একথাই বলা যায়, মনোযোগ হল এমন একটি
কেন্দ্রানুগ মানসিক প্রক্রিয়া,
যা ব্যক্তিকে পরিবেশের মধ্যে অবস্থিত বহু বিষয় বা উদ্দীপকের মধ্যে থেকে একটি সুনির্দিষ্ট
বিষয় বা উদ্দীপক নির্বাচন করতে বাধ্য করে এবং সেই বিষয় বা উদ্দীপক সম্পর্কে জ্ঞান লাভে
সহায়তা করে।
মনোযোগের
নির্ধারক বা শর্ত
মনোযোগ হল
একটি নির্বাচন ধর্মী প্রক্রিয়া,
যা ব্যক্তিকে বহু উদ্দীপকের মধ্যে থেকে একটি উদ্দীপককে নির্বাচন করতে বাধ্য করে। এক্ষেত্রে এই নির্বাচন প্রক্রিয়াটি নির্ভর করে নানাবিধ বিষয়ের
উপর যেগুলি মনোযোগের নির্ধারক নামে পরিচিত। অর্থাৎ যেসব বিষয়ের
জন্য ব্যক্তি কোন একটি বিশেষ উদ্দীপককে নির্বাচন করতে বাধিত হয়, সেই বিষয়গুলিকে বলে
মনোযোগের নির্ধারক। মনোযোগের এই সমস্ত
নির্ধারকগুলিকে তাদের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী দু ভাগে ভাগ করা যায় তথা ১) ব্যক্তিগত নির্ধারক
এবং ২) বস্তুগত নির্ধারক। নিম্নে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা
করা হলঃ
ক)
মনোযোগের ব্যক্তিগত নির্ধারক
যেসমস্ত মানসিক
বিষয় ব্যক্তির মনোযোগ আকর্ষণে সহায়তা করে,
তাদের বলে মনোযোগের ব্যক্তিগত নির্ধারক। এই সমস্ত নির্ধারকগুলি
হল –১) অভ্যাস –
অভ্যাসের বশবর্তী হয়েই মানুষ কোন বিষয়ের প্রতি মনযোগী হয়ে থাকে। যেমন যাদের ভোরে উঠে ব্যায়াম করার অভ্যাস তারা ঘুম থেকে উঠেই
সেটার প্রতিই মনযোগী হয়ে পড়ে।
২) আগ্রহ –
ম্যাকডুগাল –এর মতে, আগ্রহ হল সুপ্ত মনোযোগ
এবং মনোযোগ হল সক্রিয় অনুরাগ। আগ্রহ মনোযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত নির্ধারক। যার খবর শোনার প্রতি আগ্রহ আছে সে T.V চালু করেই খবরের চ্যানেল
খোঁজে।
৩) আবেগ –
মানুষের আবেগের মাধ্যমেও
মনোযোগ নির্ধারিত। যাকে আমরা ভালোবাসি তার ভালো গুনগুলির প্রতি আমাদের মনোযোগ আকৃষ্ট
হয়।
৪) মানসিক প্রবণতা –
ব্যক্তির নির্দিষ্ট
দিকের প্রবণতা মনোযোগের অন্যতম ব্যক্তিগত নির্ধারক। যার সংগীতের প্রতি
প্রবণতা আছে তার মনোযোগ আকৃষ্ট হয় সংগীতে।
৫) সেন্টিমেন্ট –
সেন্টিমেন্ট
হল এক ধরণের মানসিক অবস্থা যা কোনো ব্যক্তি,
ঘটনা, বস্তু বা
বিষয়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। যেমন ধর্মের প্রতি বিশ্বাস হল এক ধরণের সেন্টিমেন্ট। যার ধর্মে বিশ্বাস আছে সে ধর্মীয় বিষয়ের প্রতি সহজেই মনযোগীহয়।
৬) সহজাত প্রবৃত্তি –
সহজাত প্রবৃত্তি অনেক সময় আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে বাধ্য করে। যেমন খিদা হল এক প্রকার সহজাত প্রবৃত্তি। তাই যখন আমাদের খিদে পায়, তখন আমরা খাওয়ার সামগ্রীর প্রতি মনযোগী হই।
৭) কৌতূহল –
দৈনন্দিন চলার পথে আমরা অনেক ঘটনার মুখো মুখি হই। অধিকাংশ মানুষই বেশির ভাগ ঘটনার প্রতি মনযোগী হয় না। কিন্তু যারা কৌতূহলী তারা যতটা সম্ভব বেশি সংখ্যক ঘটনার প্রতি
মনোযোগ দেয়।
খ) মনোযোগের বস্তুগত নির্ধারক –
বাহ্যিক জগতের বিভিন্ন বস্তু বা বিষয় যখন আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ
করে তখন তাকে মনোযোগের বস্তুগত নির্ধারক বলে। এই সমস্ত নির্ধারকগুলি
হল –
১) তীব্রতা –
উদ্দীপকগুলির মধ্যে যে উদ্দীপকটির তীব্রতা সব থেকে বেশি তার
প্রতি আমাদের মনোযোগ আপনা থেকেই চলে যায়। যেমন উজ্জ্বল রং বা
তীব্র শব্দ সহজেই আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে।
২) আকার –
মনোযোগ আকর্ষণ করার ক্ষেত্রে আকার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
পালন করে। তাই ছোট বস্তুর তুলনায় বড়ো বস্তুটি তাড়াতাড়ি আমাদের মনোযোগকে
আকৃষ্ট করে।
৩) গতিশীলতা –
স্থির বস্তুর তুলনায় গতিশীল বস্তু আমাদের মনোযোগ সহজেই আকর্ষণ
করে। চলমান আলোর বিজ্ঞাপনে প্রতি আমরা সহজেই আকৃষ্ট হই।
৪) নতুনত্ব –
নতুন জিনিস সহজেই
আমাদের মনোযোগকে আকর্ষণ করতে বাধ্য করে। নতুন বই বা খেলনার
দ্বারা শিশু খুব তাড়াতাড়ি আকর্ষিত হয়।
৫) পরিবর্তনশীলতা –
আকস্মিক পরিবর্তন আমাদের মনকে সহজেই আকর্ষণ করে। মোটরগাড়ি চলতে চলতে হঠাৎ থেমে গেলে তা আমাদের মনোযোগকে আকর্ষণ
করে।
৬) পুনরাবৃত্তি –
একই জিনিস পুনরাবৃত্তি হলে তার দ্বারা আমাদের মনোযোগ আকৃষ্ট
হয়। শ্রেণীকক্ষে একই বিষয়বস্তু বারেবারে উপস্থাপিত হওয়ার জন্য শিক্ষার্থীরা
আবশ্যিকভাবে তার প্রতি মনোযোগী হয়।
৭) বৈসাদৃশ্য –
মনোযোগ আকর্ষণ করার
অন্যতম কারণ হল বৈসাদৃশ্য। একজন চারফুট মানুষের পাশাপাশি আরেকজন ৭ ফুট মানুষ হাঁটলে তার
প্রতি আমাদের মনোযোগ নিজের থেকেই চলে যায়।
৮) গোপনীয়তা –
গোপন জিনিসের প্রতি
স্বতঃস্ফূর্তভাবেই আমাদের মনোযোগ ধাবিত হয়। তা জানার জন্য আমরা
উদগ্রীব হই।
৯) বিচ্ছিন্নতা –
একাধিক উদ্দীপকের মধ্যে কোনও একটি উদ্দীপককে আলাদা করলে তা আমাদের
মনোযোগ আকর্ষণ করে। যেমন রামধনুর সাতটি রং থেকে একটি রং সরিয়ে নিলে সেই রং টির প্রতি
আমাদের মনোযোগ আকৃষ্ট হয়।
১০) স্পষ্টতা –
অস্পষ্ট জিনিসের চেয়ে স্পষ্ট জিনিস আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে। তাই অস্পষ্ট হাতের লেখার চেয়ে স্পষ্ট হাতের লেখার প্রতি আমরা
মনোযোগী হই।
উপসংহার –
মনোযোগের উপরিউক্ত নির্ধারক গুলি ছাড়াও আরও একাধিক নির্ধারক রয়েছে। তবে উভয়ের মধ্যে তুলনামূলক আলোচনা করলে দেখা যাবে যে, ব্যক্তির মনোযোগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে বস্তুগত নির্ধারকের চেয়ে ব্যক্তিগত নির্ধারকের ভূমিকাই মুখ্য। কারণ ব্যক্তিগত নির্ধারকের জন্যই মনোযোগের বস্তুগত নির্ধারকগুলি সক্রিয় হয়ে উঠে।
- ঘোড়াই নিমাই চাঁদ; উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাবিজ্ঞান; ABS Publishing House
- ভট্টাচার্য দিব্যেন্দু, বর্মণ প্রনব; উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাবিজ্ঞানের রূপরেখা; Nurture Publication
- ইসলাম নুরুল; উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাবিজ্ঞান; শ্রীধর প্রকাশনী
বিশেষ দ্রষ্টব্য : লেখাটি আপনার পড়াশুনার ক্ষেত্রে কাজে লাগলে সোশ্যাল মিডিয়ায় অবশ্যই বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন। আর এই পোস্ট সম্পর্কিত আপনার কাছে নতুন কোনও তথ্য থাকলে কমেন্টের মাধ্যমে বা ইমেইল করে আমাদের জানান।

1 Comments
এরকম নোট আরো চাই স্যার। অনেক উপকারী নোট
ReplyDelete